বিমানবন্দরে বিশৃঙ্খলা ও সরকারি কাজে বাধা দেওয়ার অভিযোগে গ্রেপ্তার জামায়াতে ইসলামীর নেতা মেজর (অব.) আখতারুজ্জামানকে শনিবার আদালতে হাজির করা হয়। আদালতে নেওয়ার পথে প্রিজন ভ্যান থেকে নামার সময় হেলমেট ছুড়ে ফেলা, এজলাসে বিচারককে নিয়ে মন্তব্য এবং আদালত প্রাঙ্গণে স্লোগান দেওয়াকে কেন্দ্র করে নতুন করে আলোচনায় আসেন তিনি। পরে শুনানি শেষে তাঁর এক দিনের রিমান্ড মঞ্জুর করেন আদালত।
এর আগে শুক্রবার রাজধানীর ক্যান্টনমেন্ট এলাকার ডিওএইচএসের বাসা থেকে তাঁকে গ্রেপ্তার করে ঢাকা মহানগর পুলিশের গোয়েন্দা বিভাগ (ডিবি)। শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে লাগেজ ও ট্রলি সংকটকে কেন্দ্র করে বিশৃঙ্খলা সৃষ্টি এবং সরকারি কাজে বাধা দেওয়ার অভিযোগে করা মামলায় তাঁকে গ্রেপ্তার দেখানো হয়।
প্রিজন ভ্যান থেকে হেলমেট ছুড়ে ফেলেন
শনিবার দুপুর সাড়ে ১২টার কিছু পর আখতারুজ্জামানকে প্রিজন ভ্যানে করে আদালত ভবনের সামনে নেওয়া হয়। সেখানে সাংবাদিকদের উদ্দেশে তিনি বলেন, রাষ্ট্রের ‘মিস ম্যানেজমেন্ট’ আর চলতে পারে না এবং এভাবে কোনো সরকার টিকে থাকতে পারে না।
পুলিশ সদস্যরা তাঁকে প্রিজন ভ্যান থেকে নামানোর সময় তিনি হাত না ধরতে বলেন। পরে পুলিশ তাঁর হাতে হাতকড়া ও মাথায় হেলমেট পরায়। ভ্যান থেকে বের হওয়ার সময় মাথার হেলমেট খুলে ছুড়ে ফেলেন আখতারুজ্জামান। এ সময় তাঁকে বলতে শোনা যায়, ‘আমি আওয়ামী লীগের না।’
এরপর হেলমেট ছাড়াই তাঁকে আদালতে নেওয়া হয়। এজলাসে ওঠানোর সময় তিনি ‘ইনকিলাব জিন্দাবাদ’ ও ‘বাংলাদেশ জিন্দাবাদ’ স্লোগান দেন। বাইরে থাকা জামায়াতের নেতা-কর্মীরাও স্লোগান দেন।
শুনানিতে কী হয়েছে—দুই পক্ষের দুই বক্তব্য
আখতারুজ্জামানের বিরুদ্ধে করা মামলায় তাঁকে পাঁচ দিনের রিমান্ডে নেওয়ার আবেদন করেন মামলার তদন্ত কর্মকর্তা বিমানবন্দর থানার উপপরিদর্শক মাজেদুল ইসলাম। তাঁর আইনজীবীরা জামিনের আবেদন করেন।
রিমান্ড আবেদনের শুনানি হয় ঢাকার মেট্রোপলিটন ম্যাজিস্ট্রেট আলবিরুনী মীরের আদালতে।
রাষ্ট্রপক্ষের পাবলিক প্রসিকিউটর (পিপি) ওমর ফারুক ফারুকীর ভাষ্য, আদালতে আসার পর থেকেই আখতারুজ্জামান পুলিশের প্রতি ক্ষুব্ধ ছিলেন এবং পুলিশ, সাংবাদিকসহ উপস্থিত সবাইকে বের করে দিতে বলেন। তাঁর দাবি, শুনানির সময় তিনি আদালত ও প্রসিকিউশন পক্ষের প্রতি বিরূপ ও আক্রমণাত্মক বক্তব্য দেন।
পিপির আরও দাবি, আখতারুজ্জামান বিচারকের ক্ষমতা নিয়ে প্রশ্ন তোলেন এবং বিচারককে হেয় করে মন্তব্য করেন। আদালত তাঁকে শান্ত হতে এবং প্রতিবাদের ভাষা সংযত রাখার কথা বললেও তিনি একই ধরনের বক্তব্য দিতে থাকেন বলে জানান পিপি।
তবে আসামিপক্ষের আইনজীবী আব্দুর রাজ্জাক এ বক্তব্য অস্বীকার করেছেন। তাঁর দাবি, আখতারুজ্জামান শুনানিতে সুন্দর বক্তব্য দিয়েছেন এবং বিচারককে হেয় করে কোনো কথা বলেননি। বরং পিপিই তাঁকে হেয় করে বক্তব্য দিয়েছেন বলে দাবি করেন তিনি।
আইনজীবী আরও বলেন, মামলাটি উদ্দেশ্যপ্রণোদিত এবং রাজনৈতিকভাবে হেয় করার জন্য করা হয়েছে। তাঁর দাবি, এটি জামিনযোগ্য মামলা।
এক দিনের রিমান্ড
শুনানি শেষে ম্যাজিস্ট্রেট আলবিরুনী মীর আখতারুজ্জামানের এক দিনের রিমান্ড মঞ্জুর করেন। এর আগে পুলিশ পাঁচ দিনের রিমান্ড চেয়েছিল।
রিমান্ড শেষে আদালত ভবন থেকে বের করার সময় তাঁর মাথায় আবার হেলমেট ও হাতে হাতকড়া ছিল। কেন হেলমেট পরানো হয়েছে—সাংবাদিকদের এমন প্রশ্নের জবাবে আখতারুজ্জামান বলেন, পুলিশ জোর করে তাঁকে হাতকড়া ও হেলমেট পরিয়েছে।
যে মামলায় গ্রেপ্তার
মামলার এজাহার অনুযায়ী, গত বৃহস্পতিবার মদিনা থেকে আসা বাংলাদেশ বিমানের একটি ফ্লাইটে বিপুলসংখ্যক যাত্রী ঢাকায় আসেন। যাত্রীর চাপের কারণে লাগেজ পেতে বিলম্ব এবং একই সময়ে ট্রলি সংকট দেখা দিলে বিমানবন্দরে অসন্তোষ তৈরি হয়।
পরিস্থিতি সামাল দিতে বিমানবন্দরের নির্বাহী পরিচালক সেখানে গেলে তাঁর সঙ্গে আখতারুজ্জামানের কথা-কাটাকাটি হয় বলে মামলায় অভিযোগ করা হয়েছে। এজাহারে তাঁর বিরুদ্ধে নির্বাহী পরিচালককে হুমকি দেওয়ার অভিযোগও রয়েছে।
এ ছাড়া তাঁর সঙ্গে থাকা ব্যক্তিদের বিমানবন্দরের সংরক্ষিত এলাকায় ভিডিও ধারণে বাধা দেওয়ার সময় এক নিরাপত্তা কর্মকর্তাকে গালিগালাজ ও শারীরিকভাবে লাঞ্ছিত করার অভিযোগ আনা হয়েছে। মামলায় জমজমের পানির বোতল ছুড়ে ফেলা এবং বিমান বাংলাদেশ এয়ারলাইনসের এক প্রতিনিধির সঙ্গে মারমুখী আচরণের অভিযোগও রয়েছে।
রাজনীতিতে দীর্ঘ পথচলা
আখতারুজ্জামান কিশোরগঞ্জ-২ আসন থেকে বিএনপির মনোনয়নে ১৯৯১ ও ১৯৯৬ সালে টানা দুইবার সংসদ সদস্য নির্বাচিত হন। পরে ২০১৮ সালের জাতীয় সংসদ নির্বাচনে ধানের শীষ প্রতীকে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করে পরাজিত হন। ২০২৪ সালের নির্বাচনে স্বতন্ত্র প্রার্থী হিসেবেও তিনি পরাজিত হন।
তিনি একসময় কিশোরগঞ্জ জেলা বিএনপির সভাপতি ছিলেন। দলীয় শৃঙ্খলাবিরোধী কর্মকাণ্ডের অভিযোগে ২০২২ সালের ২০ ফেব্রুয়ারি তাঁকে বিএনপি থেকে বহিষ্কার করা হয়। পরে ২০২৫ সালের ১৩ ডিসেম্বর জামায়াতে ইসলামীতে যোগ দেন।
আদালত প্রাঙ্গণ থেকে বের হওয়ার সময় সাংবাদিকদের উদ্দেশে আখতারুজ্জামান বলেন, রাষ্ট্রকে সঠিক পথে পরিচালনা ও মানুষের অধিকার বাস্তবায়নের জন্য নতুন করে সংগ্রামে নামতে হবে। জামায়াতে ইসলামী সেই সংগ্রাম অব্যাহত রাখবে বলেও তিনি মন্তব্য করেন।
এদিকে জামায়াতের সমালোচনা এবং জুলাই গণ-অভ্যুত্থানে ক্ষমতাচ্যুত প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার প্রশংসা করে অতীতে আখতারুজ্জামানের দেওয়া কিছু বক্তব্য সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়েছে।
সম্পাদক: লিটন আফরোজ।
নিউজ ডিবিএন | আপনার আস্থার সংবাদমাধ্যম