

কটনউডের বাতাসে ভেসে বেড়ানো সাদা তুলার মেঘ, শতবর্ষী ওক আর সুগার ম্যাপলের প্রাচীন ডালে কাঠবিড়ালির চপল লুকোচুরি, আর তার পায়ের নিচে অনন্তকাল ধরে বয়ে চলা মিসৌরি নদীর ধীর স্রোত– বিদায়ী রাগে চারপাশটা বুঝি এমনই চেয়েছিলেন লিওনেল মেসি। কানসাসে এসে এক আর্জেন্টাইন সাংবাদিকের কাছে শোনা– মেসির চাওয়াতেই নাকি এই কানসাস সিটিকে বেস ক্যাম্প হিসেবে বেছে নিয়েছে তারা। কাল এই শহর থেকেই শেষের শুরু করতে যাচ্ছেন মেসি। যেখানে বিদায়ী রাগের প্রতিটি তানে বিষাদের সুর তোলার ব্যাকুলতা।
ইতিহাস ভেঙে গড়ার আনন্দও অবশ্য আছে তাতে। এই যেমন আলজেরিয়ার বিপক্ষে ম্যাচটিই হতে যাচ্ছে তাঁর দেশের হয়ে ২০০তম ম্যাচ। আর্জেন্টিনার হয়ে যে রেকর্ড আর কারোরই নেই। অধিনায়ক হিসেবেও কানসাসে একটি মাইলফলক নির্মাণ করে যাবেন তিনি। বিশ্বকাপে এখন পর্যন্ত ২৩ ম্যাচ আর কেউ তাঁর দেশকে নেতৃত্ব দিতে পারেননি, যা মেসি করে দেখিয়েছেন। বিশ্বকাপে সবচেয়ে বেশি ২,৩১৪ মিনিট পর্যন্ত মাঠে থাকা একমাত্র ফুটবলারও তিনি।
কাল যখন ম্যাচের আগে বুকে হাত রেখে জাতীয় সংগীতের সঙ্গে ঠোঁট মেলাবেন, তখনও ইতিহাসে লেখা হয়ে যাবে তাঁর নামটি– ষষ্ঠ বিশ্বকাপ খেলা প্রথম কিংবদন্তিই যে তিনি। ফুটবল ইতিহাসের এমন আস্ত এক উপন্যাসের শেষ অধ্যায়ে দাঁড়িয়ে কানসাসে কান পাতলে শোনা যাচ্ছে আলো নিভে আসা পূরবী রাগ।
এ এক অদ্ভুত অবাস্তব সমাপতন। ঠিক কুড়ি বছর আগে, ২০০৬ সালের এই ১৬ জুনের রক্তিম বিকেলেই জার্মানির মাঠে বছর আঠারোর এক কিশোর তাঁর প্রথম বিশ্বকাপ ম্যাচ খেলেছিলেন; করেছিলেন প্রথম গোলটিও। আর আজ ঠিক ১৬ জুনের (স্থানীয় সময় অনুযায়ী) পড়ন্ত বিকেলেই তিনি নামছেন নিজের ষষ্ঠ বিশ্বকাপ অভিযানে। সেদিন সার্বিয়া অ্যান্ড মন্টেনেগ্রোর ম্যাচে ৭৪ মিনিটে ম্যাক্সি রদ্রিগেজের বদলি হিসেবে ম্যাচে নেমেছিলেন তিনি। মাত্র ১৩ মিনিটের মধ্যেই গোল করেছিলেন।
সেই শুরু, এরপর একে একে ২০১০ দক্ষিণ আফ্রিকা, ২০১৪ ব্রাজিল, ২০১৮ রাশিয়া, ২০২২ কাতার আর এবারের ২০২৬-এর (যুক্তরাষ্ট্র, কানাডা ও মেক্সিকো) হয়ে দুই দশকের একটা বৃত্ত পূরণ। দু-দুবার বিশ্বকাপের ফাইনাল। একবার ব্রাজিলে চোখের জলে অপূর্ণতা, অন্যবার কাতারে অমরত্ব লাভ। মেসি নিজেই বলেছেন একবার– তাঁর আর কোনো অপূর্ণতা নেই। তাঁর ফুটবল-ঈশ্বরের কাছে আর কিছু চাওয়ারও নেই। তবে নতুন প্রজন্মের জন্য উত্তরসূরি তিনি খুঁজে দিয়ে যেতে চান। আর্জেন্টিনার জার্সির গায়ে চারটি তারার চিহ্ন এঁকে দিয়ে যেতে চান।
আর্জেন্টিনাও যে প্রচণ্ডভাবে মেসির জন্য চায় কিছু। বিশ্বকাপে সর্বোচ্চ গোলদাতা জার্মানির মিরোস্লাভ ক্লোসা। ১৬ গোল আছে তাঁর। প্রত্যেক আর্জেন্টাইন সমর্থকের আকুলতা– এই রেকর্ডটি হয়ে থাকুক তাদের প্রিয় মানুষটির। ১৩ গোল করা মেসি এবারে অন্তত আরও চারটি গোল করে সবার ওপরে থাকুক। গ্রুপ পর্বে আলজেরিয়া, অস্ট্রিয়া আর জর্ডানের বিপক্ষে তিনটি ম্যাচ বাদ দিলে নকআউটে আর কিছু ম্যাচ পাবেন তিনি। ক্লোসা নিজেই এক সাক্ষাৎকারে জানিয়েছেন, অন্য কেউ নন; তাঁর রেকর্ড যদি কেউ ভাঙতে পারে, তাহলে সেই নামটি লিওনেল মেসি। তিনি নিজেও খুশি হবেন, যদি মেসিই ভাঙেন তাঁর রেকর্ডটি।
আচ্ছা, মেসি নিজে কখনও এসব রেকর্ড নিয়ে ভাবেন কি? এই যে তাঁর হোটেলের সামনে প্রতিদিন জনারণ্য, তাদের প্রাণের ভাষাটা পড়তে পারেন কি? কানসাসের হোটেলে যে ২০২ নম্বর রুমটিতে তিনি আছেন, সেখানে নাকি রাত ৯টার মধ্যেই আলো নিভে যায়। আগেরবার কাতারে বন্ধু আগুয়েরোকে ডেকে নিয়ে এসেছিলেন একসঙ্গে রাতে গল্প করবেন বলে। এবার অবশ্য তেমন কিছু শোনা যায়নি। এই দলে রদ্রিগে ডি পলই একমাত্র তাঁর বন্ধু এবং সহচারীর মতো। সেই তাঁকেও এবার পাশের রুমে পাঠিয়ে দিয়েছেন ওতামেন্ডির কাছে। শেষ বিশ্বকাপে নামার আগে এসব একাকিত্ব নয়, বরং রাজকীয় গাম্ভীর্য মেশানো থাকে তাতে। কানসাসের টিম হোটেলে আসেনি স্ত্রী-সন্তানের কেউ। তবে আজ নাকি রোকুজ্জো তাদের তিন ছেলে থিয়াগো, মাতেও আর চিরোকে নিয়ে মায়ামি থেকে আসবেন কানসাসে। রাগিণীর সুরে তারাও থাকবেন মেসিরই পাশে।
মন্তব্য করুন