
রাজধানীতে দীর্ঘদিনের গ্যাস সংকট এবার চরম আকার ধারণ করেছে। কক্সবাজারের মহেশখালীর ভাসমান এলএনজি (এফএসআরইউ) টার্মিনালে কারিগরি ত্রুটির কারণে জাতীয় গ্রিডে গ্যাস সরবরাহ কমে যাওয়ায় আবাসিক, শিল্প ও পরিবহন সব খাতেই দেখা দিয়েছে তীব্র সংকট। রাজধানীর অনেক এলাকায় দিনের পর দিন রান্নার চুলা জ্বলছে না। অন্যদিকে সিএনজি ফিলিং স্টেশনগুলোতে গ্যাসের চাপ কম থাকায় ঘণ্টার পর ঘণ্টা অপেক্ষা করেও গ্যাস পাচ্ছেন না চালকরা। এতে নগরবাসীর দৈনন্দিন জীবনযাত্রা ব্যাহত হওয়ার পাশাপাশি আয়-রোজগার কমে বিপাকে পড়েছেন হাজারো সিএনজিচালিত যানবাহনের চালক।
গতকাল রাজধানীর মেরুল বাড্ডা, রামপুরা, মালিবাগ, মোহাম্মদপুর ও তেজগাঁও এলাকার বিভিন্ন সিএনজি ফিলিং স্টেশন ঘুরে দেখা যায়, কোথাও দীর্ঘ সারিতে দাঁড়িয়ে আছে ব্যক্তিগত গাড়ি, কোথাও সিএনজিচালিত অটোরিকশা। অনেক স্টেশনে গ্যাসের চাপ এত কম যে স্বাভাবিকভাবে সরবরাহ দেওয়া যাচ্ছে না। কয়েকটি স্টেশন সাময়িকভাবে বন্ধও রাখা হয়েছে। অনেক চালক আগের রাত থেকে লাইনে অবস্থান করলেও গ্যাস পাননি।
মেরুল বাড্ডার একটি সিএনজি স্টেশনে অপেক্ষমাণ কয়েকজন চালক বলেন, আগের দিন সন্ধ্যা থেকে গ্যাসের জন্য অপেক্ষা করছেন। রাতেও পাননি, সকালে আবার লাইনে দাঁড়িয়েছেন। কিন্তু কখন গ্যাস মিলবে, সে নিশ্চয়তা নেই। একজন অটোরিকশাচালক বলেন, গাড়ি চালাতে না পারলে মালিকের জমা দেব কীভাবে? সংসার চালানোই কঠিন হয়ে পড়েছে।
সিএনজি স্টেশন পরিচালনাকারীরাও বলছেন, জাতীয় গ্রিডে সরবরাহ কমে যাওয়ায় তারা স্বাভাবিকভাবে গ্যাস বিক্রি করতে পারছেন না। অনেক স্টেশনে সারা দিনে একবারও গ্যাস সরবরাহ দেওয়া সম্ভব হয়নি। ফলে যাত্রী পরিবহন, পণ্য পরিবহন এবং রাইড-শেয়ারিং সেবাও ব্যাহত হচ্ছে।
একই চিত্র রাজধানীর আবাসিক এলাকাগুলোতেও। মোহাম্মদপুর, ধানমন্ডি, কলাবাগান, কাঁঠালবাগান, শ্যামলী, মিরপুর ও বাড্ডার অনেক এলাকায় দিনের অধিকাংশ সময় গ্যাস থাকছে না। কোথাও গভীর রাতে সামান্য গ্যাস এলেও চাপ এত কম যে রান্না করা সম্ভব হচ্ছে না। এতে অনেক পরিবার বাধ্য হয়ে এলপিজি সিলিন্ডার বা বৈদ্যুতিক চুলা ব্যবহার করছে। তবে অতিরিক্ত খরচ বহন করতে না পেরে নিম্ন ও মধ্যবিত্ত পরিবার সবচেয়ে বেশি ভোগান্তিতে পড়েছে।
মোহাম্মদপুরের বাসিন্দাদের অভিযোগ, কয়েকদিন ধরে দিনের বেলায় একেবারেই গ্যাস থাকছে না। অনেক পরিবার হোটেলের খাবারের ওপর নির্ভর করছে। আবার কেউ কেউ বাধ্য হয়ে নতুন করে ইলেকট্রিক চুলা কিনছেন।
সংকটের প্রতিবাদে গতকাল মোহাম্মদপুরে স্থানীয় বাসিন্দারা মানববন্ধন করেন। তারা নিরবচ্ছিন্ন গ্যাস সরবরাহ নিশ্চিত করা, গ্যাস ছাড়া বিল আদায় বন্ধ এবং তিতাসের সেবার মান উন্নয়নের দাবি জানান। মানববন্ধনে বক্তারা বলেন, বছরের পর বছর ধরে চলা এই সমস্যার সমাধান না হওয়ায় মানুষের দুর্ভোগ অসহনীয় হয়ে উঠেছে।
জ্বালানি ও খনিজসম্পদ বিভাগ জানিয়েছে, মহেশখালীর ভাসমান এলএনজি টার্মিনালে কারিগরি ত্রুটির কারণে দৈনিক প্রায় ৪৫০ থেকে ৫০০ মিলিয়ন ঘনফুট গ্যাস সরবরাহ কমে গেছে। দেশি-বিদেশি কারিগরি বিশেষজ্ঞরা ত্রুটি মেরামতে কাজ করছেন। প্রাথমিকভাবে দুই দিনের মধ্যে পরিস্থিতির উন্নতির আশা করা হলেও সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা বলছেন, পুরোপুরি স্বাভাবিক হতে আরও সময় লাগতে পারে।
পেট্রোবাংলার তথ্য অনুযায়ী, দেশে দৈনিক গ্যাসের চাহিদা প্রায় ৩ হাজার ৮০০ মিলিয়ন ঘনফুট। স্বাভাবিক সময়েও সরবরাহ থাকে প্রায় ২ হাজার ৬৫০ থেকে ২ হাজার ৭০০ মিলিয়ন ঘনফুট। তবে এলএনজি টার্মিনালের ত্রুটির পর সরবরাহ কমে প্রায় ২ হাজার ২০০ মিলিয়ন ঘনফুটে নেমে এসেছে। ফলে আবাসিক গ্রাহক, শিল্পকারখানা, বিদ্যুৎকেন্দ্র ও সিএনজি খাতে সংকট আরও প্রকট হয়েছে।
এদিকে গ্যাসের ঘাটতির প্রভাব পড়েছে বিদ্যুৎ উৎপাদনেও। গ্যাসভিত্তিক বিদ্যুৎকেন্দ্রগুলো পর্যাপ্ত জ্বালানি না পাওয়ায় উৎপাদন কমাতে বাধ্য হচ্ছে। একই সঙ্গে শিল্পকারখানাগুলোয় প্রয়োজনীয় চাপের গ্যাস না পাওয়ায় উৎপাদন ব্যাহত হচ্ছে। উদ্যোক্তাদের আশঙ্কা, পরিস্থিতি দীর্ঘায়িত হলে উৎপাদন ব্যয় বাড়বে এবং রপ্তানি কার্যক্রমও ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারে।
জ্বালানি খাতসংশ্লিষ্টদের মতে, বর্তমান সংকটের তাৎক্ষণিক কারণ এলএনজি টার্মিনালের কারিগরি ত্রুটি হলেও এর পেছনে রয়েছে দীর্ঘদিনের গ্যাস ঘাটতি ও আমদানিনির্ভরতা। দেশীয় গ্যাস উৎপাদন কমে যাওয়ায় এলএনজির ওপর নির্ভরতা বাড়ছে। ফলে টার্মিনালে যে কোনো কারিগরি সমস্যা পুরো সরবরাহব্যবস্থাকে অস্থিতিশীল করে তুলছে। তাই সংকটের স্থায়ী সমাধানে নতুন গ্যাসক্ষেত্র অনুসন্ধান, দেশীয় উৎপাদন বৃদ্ধি এবং জ্বালানি সরবরাহব্যবস্থার সক্ষমতা বাড়ানোর ওপর গুরুত্ব দিচ্ছেন সংশ্লিষ্টরা।
মন্তব্য করুন