
রোদ্র কুমার মান্দা নওগাঁ প্রতিনিধি:
বাংলাদেশের সম্ভাবনাময় ফ্রিল্যান্সিং খাতকে ঘিরে নতুন করে উদ্বেগ তৈরি হয়েছে। আন্তর্জাতিক অনলাইন মার্কেটপ্লেস ফাইভারে অ্যাকাউন্ট নিয়ন্ত্রণ, পরিচয়সংক্রান্ত তথ্যের অপব্যবহার, ভুয়া অর্ডার ও রিভিউয়ের মাধ্যমে র্যাংকিং প্রভাবিত করার অভিযোগ উঠেছে তথ্যপ্রযুক্তি ও আউটসোর্সিং সেবা প্রদানকারী প্রতিষ্ঠান ‘বিটোপিয়া’র বিরুদ্ধে।
অভিযোগ রয়েছে, প্রতিষ্ঠানটির হাজার হাজার কর্মীর জাতীয় পরিচয়পত্র (এনআইডি) ও পাসপোর্টের তথ্য ব্যবহার করে ফাইভারে অ্যাকাউন্ট খোলা এবং সেগুলোর নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠানের ব্যবস্থাপনার হাতে রাখার ঘটনা ঘটেছে। একই সঙ্গে প্রতিযোগী ফ্রিল্যান্সারদের গিগে ভুয়া অর্ডার দিয়ে পরে তা বাতিল করার মাধ্যমে তাদের র্যাংকিং ক্ষতিগ্রস্ত করার অভিযোগও রয়েছে।
এসব অভিযোগের পরিপ্রেক্ষিতে গত জুলাইয়ের শেষ দিকে বিটোপিয়া-সংশ্লিষ্ট প্রায় ৩০০টি ফাইভার অ্যাকাউন্ট স্থগিত করা হয়েছে বলে সংশ্লিষ্ট সূত্রগুলো জানিয়েছে। একই সঙ্গে আরও কয়েক হাজার অ্যাকাউন্টকে তদন্ত ও নজরদারির আওতায় আনা হয়েছে বলে অভিযোগ রয়েছে।
বাংলাদেশের কয়েকজন ফ্রিল্যান্সারের লিখিত অভিযোগের পর ফাইভার কর্তৃপক্ষ বিষয়টি অনুসন্ধান করে বলে জানা গেছে। অনুসন্ধানের পর জুলাইয়ের শেষ দিকে বিটোপিয়া-সংশ্লিষ্ট প্রায় ৩০০টি অ্যাকাউন্ট স্থগিত করা হয়।
এ ছাড়া সংশ্লিষ্ট আরও কয়েক হাজার অ্যাকাউন্ট তদন্ত ও নজরদারির আওতায় নেওয়া হয়েছে বলে দাবি করা হয়েছে। এসব অ্যাকাউন্টের মাধ্যমে সম্পন্ন হওয়া কিছু কাজও বাতিল করা হয়েছে বলে সংশ্লিষ্টদের অভিযোগ।
এর আগে ৪ আগস্ট ফাইভার কমিউনিটি ফোরামের বাংলাদেশ অংশে ‘Ensuring fairness and integrity: an update on coordinated account manipulation’ শিরোনামে একটি বিজ্ঞপ্তি প্রকাশ করা হয়। সেখানে অন্যের হয়ে অ্যাকাউন্ট পরিচালনা, কৃত্রিমভাবে রিভিউ ও অর্ডার তৈরি এবং মার্কেটপ্লেসের অখণ্ডতা ক্ষুণ্ন করার মতো কর্মকাণ্ড শনাক্ত করতে ব্যবস্থা নেওয়ার কথা জানানো হয়।
সংশ্লিষ্টদের অভিযোগ, বিটোপিয়া গ্রুপের পাঁচ হাজারের বেশি কর্মীর এনআইডি ও পাসপোর্টের তথ্য ব্যবহার করে কর্মীদের নামে ফাইভারে অ্যাকাউন্ট খোলা হতো। তবে এসব অ্যাকাউন্টের নিয়ন্ত্রণ সংশ্লিষ্ট কর্মীদের হাতে না থেকে প্রতিষ্ঠানটির ব্যবস্থাপনার কাছে থাকত বলে অভিযোগ রয়েছে।
এমনকি চাকরি ছেড়ে দেওয়ার পরও কর্মীরা নিজেদের নামে খোলা ফাইভার অ্যাকাউন্টের নিয়ন্ত্রণ ফিরে পেতেন না বলে দাবি করেছেন কয়েকজন সাবেক কর্মী।
ফাইভারের নীতিমালা অনুযায়ী, একজন ব্যবহারকারীর পরিবর্তে অন্য ব্যক্তি বা তৃতীয় পক্ষের মাধ্যমে অ্যাকাউন্ট পরিচালনার সুযোগ নেই। এ ধরনের নীতিমালা লঙ্ঘনের অভিযোগে অ্যাকাউন্টগুলোতে ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছে বলে সংশ্লিষ্টরা জানিয়েছেন।
বিটোপিয়ার বিরুদ্ধে ওঠা অভিযোগগুলোর মধ্যে অন্যতম হলো—প্রতিদ্বন্দ্বী ফ্রিল্যান্সারদের গিগে ভুয়া অ্যাকাউন্ট থেকে অর্ডার দিয়ে পরে তা বাতিল করা।
সম্প্রতি ফ্রিল্যান্সার এম এন নাহিদের একটি ফাইভার গিগে বিটোপিয়া-সংশ্লিষ্ট একটি অ্যাকাউন্ট থেকে অর্ডার দিয়ে পরে তা বাতিল করার অভিযোগ সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে আলোচনায় আসে। তবে বিটোপিয়া এ অভিযোগ অস্বীকার করেছে বলে সংশ্লিষ্ট সূত্র জানিয়েছে।
এ ঘটনায় নাহিদের বিরুদ্ধে থানায় সাধারণ ডায়েরি (জিডি) করা হয়। পরে তাকে থানায় নিয়ে হেনস্তা করা হয়েছে বলেও অভিযোগ করেন তিনি।
একজন সাবেক কর্মীর দাবি, ফাইভারের অ্যালগরিদমে অর্ডার বাতিলের প্রভাব পড়তে পারে। ফলে পরিকল্পিতভাবে অর্ডার দিয়ে তা বাতিল করা হলে সংশ্লিষ্ট ফ্রিল্যান্সারের গিগের পারফরম্যান্স ও র্যাংকিং ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ার আশঙ্কা থাকে।
নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক কয়েকজন ফ্রিল্যান্সার অভিযোগ করেন, এ ধরনের কর্মকাণ্ডের কারণে দীর্ঘদিন ধরে কাজ করা ফ্রিল্যান্সারদের গিগের র্যাংকিং ও ব্যবসা ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারে। তাদের দাবি, একটি গিগের অবস্থান পুনরুদ্ধারে দীর্ঘ সময় প্রয়োজন হয় এবং এতে আর্থিক ক্ষতির পাশাপাশি পেশাগতভাবেও চাপ তৈরি হয়।
বিটোপিয়া গ্রুপের বিরুদ্ধে ফাইভার-সংক্রান্ত অভিযোগের পাশাপাশি প্রতিষ্ঠানটির অভ্যন্তরীণ কর্মপরিবেশ নিয়েও বিভিন্ন অভিযোগ করেছেন কয়েকজন সাবেক কর্মী।
তাদের অভিযোগের মধ্যে রয়েছে কর্মীদের পাসপোর্ট আটকে রাখা, চাকরি ছাড়তে চাইলে মামলার ভয় দেখানো, শারীরিক নির্যাতন, কম পারিশ্রমিকে কাজ করানো, প্রভিডেন্ট ফান্ড ও উৎসব ভাতার সুস্পষ্ট নীতি না থাকা এবং বেতন বৈষম্য।
এ ছাড়া ইন্টার্নশিপের এক মাস পর ‘মূল্যায়ন স্কোর’-এর অজুহাতে গণছাঁটাই করা হয়েছে বলেও কয়েকজন সাবেক প্রকৌশলী অভিযোগ করেছেন।
তবে এসব অভিযোগের স্বতন্ত্র যাচাই করা সম্ভব হয়নি।
সাবেক কর্মীদের আরও দাবি, ফায়ারএআই (FireAI), জেভিএআই (JVAI), স্পার্কটেক (SparkTech), সফটভেন্স (SoftVence) ও এসএমটেক (SMTech)সহ বিভিন্ন সহযোগী প্রতিষ্ঠানের নামে নিয়োগ বিজ্ঞপ্তি দেওয়া হতো। তাদের ভাষ্য অনুযায়ী, প্রতিষ্ঠানটি আগে ‘বিডি কলিং আইটি’ (BD Calling IT) নামে কার্যক্রম পরিচালনা করলেও পরবর্তী সময়ে ‘বিটোপিয়া’ নামে কার্যক্রম চালায়।
বিটোপিয়ার বিরুদ্ধে ওঠা এসব অভিযোগের প্রভাব নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন কয়েকজন ফ্রিল্যান্সার। তাদের আশঙ্কা, নির্দিষ্ট কোনো প্রতিষ্ঠানের কর্মকাণ্ডের কারণে আন্তর্জাতিক মার্কেটপ্লেসে বাংলাদেশি ফ্রিল্যান্সারদের অ্যাকাউন্টের ওপর অতিরিক্ত নজরদারি বা যাচাই বাড়তে পারে।
ফ্রিল্যান্সারদের দাবি, দীর্ঘদিন ধরে পরিশ্রম করে গড়ে তোলা ক্যারিয়ার যেন কোনো সংঘবদ্ধ বা অনিয়মপূর্ণ কর্মকাণ্ডের কারণে ক্ষতিগ্রস্ত না হয়, সে বিষয়ে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের নজর দেওয়া প্রয়োজন।
তাদের আরও দাবি, আন্তর্জাতিক মার্কেটপ্লেসে বাংলাদেশের ফ্রিল্যান্সারদের আস্থা ও সুনাম ধরে রাখতে স্বচ্ছ প্রতিযোগিতার পরিবেশ নিশ্চিত করা জরুরি।
মন্তব্য করুন